ভূমিকম্প ও সুনামি: বাংলাদেশে ঝুঁকি কতটা?

**ভূমিকম্প ও সুনামি: বাংলাদেশে ঝুঁকি কতটা?**

* দেশে সম্প্রতি একাধিকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যার মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পও ছিল।
* ইন্দোনেশিয়া বা আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বড় ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশেও সুনামির ঝুঁকি থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
* ভূমিকম্পের মাত্রা ৬.৫ এর বেশি হলে এবং সমুদ্রতলে কম্পন সৃষ্টি হলে সুনামি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
* ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র সবসময় সুনামির বিষয়ে সতর্ক থাকে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়।
* তবে, বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভূমিতে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি সাগরের ভূমিকম্পের চেয়ে বেশি।

**ভূমিকম্প ও সুনামি: বাংলাদেশে ঝুঁকি কতটা?**

গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার (২৬ নভেম্বর) রাতে বঙ্গোপসাগরে চার মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) ইন্দোনেশিয়ায় ছয় দশমিক ছয় মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছে, তবে এতে বড় কোনো সুনামির খবর পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইন্দোনেশিয়া বা আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দিকে বড় ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশেও সুনামির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় নয় দশমিক এক মাত্রার এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে দুই লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং সেই সুনামি আফ্রিকার দেশগুলো পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সেই সুনামির ধাক্কা বাংলাদেশেও লেগেছিল এবং তাতে দুইজনের মৃত্যুর খবর জানা যায়।

ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানিয়েছেন, সাগরে ভূমিকম্পের মাত্রা ছয় দশমিক পাঁচের বেশি হলে সুনামি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুনামি সার্ভিস প্রোভাইডাররা এটি পর্যবেক্ষণ করেন এবং কোথায়, কখন এবং পানির উচ্চতা কতটা হতে পারে সে বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরে প্রায়শই ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, তবে চার মাত্রা বা এর চেয়ে দুর্বল ভূমিকম্প থেকে বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা থাকে না।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভূমিতে বড় ভূমিকম্প হলেও উপকূলে সুনামির শঙ্কা থাকে। পৃথিবীর উপরিভাগ বিভিন্ন টেকটনিক প্লেটে বিভক্ত, যেগুলোর নড়াচড়া ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি করে।

সুনামি হলো বিশাল আকারের জলোচ্ছ্বাস, যা সাধারণত খুব শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণে সমুদ্রতলদেশের নড়াচড়ার ফলে সৃষ্টি হয়। সমুদ্রের তলদেশ উপরে বা নিচে ঠেলে গেলে এবং বিশাল পরিমাণ পানি সরে গেলে সুনামি ঘটাতে পারে।

ভূপ্রাকৃতিকভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, যা ‘রিং অফ ফায়ার’ নামে পরিচিত, সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। বড় সুনামি সৃষ্টিকারী সাবডাকশন জোনগুলো বাংলাদেশ থেকে বেশ দূরে অবস্থিত। তবে বাংলাদেশ দুটি বড় টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে রয়েছে, যা চট্টগ্রাম-আরাকান থেকে আন্দামানের দিকে বিস্তৃত। এই অঞ্চলে সুনামির ঝুঁকি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি সাগরের নিচে নিকট সময়ে বড় ভূমিকম্প এবং তা থেকে সুনামির শঙ্কা নেই। ফারজানা সুলতানা বলেন, স্বাভাবিক ভূমিকম্প থেকে তেমন সুনামির ঝুঁকি নেই, তবে আন্দামান-নিকোবরে ভূমিকম্প হলে তা বাংলাদেশের জন্য একটি সোর্স অঞ্চল হতে পারে। এক্ষেত্রে তারা সবসময় প্রস্তুত থাকেন যেন তাৎক্ষণিক সতর্কতা অবলম্বন করা যায়।

অতীতে, ১৯৬২ সালে আরাকান উপকূলে প্রায় সাড়ে আট মাত্রার এক ভূমিকম্প থেকে বড় সুনামি হয়েছিল। ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, এই প্লেটে ভূমিকম্প হলে বড় সুনামির আশঙ্কা রয়েছে, তবে অতি শীঘ্রই এমন বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কম। তিনি আরও জানান, একবার বড় ভূমিকম্পের পর ওই প্লেটে শক্তি সঞ্চয় হতে এবং পরবর্তী ভূমিকম্প হতে ৫০০ থেকে ৯০০ বছর সময় লাগতে পারে। সেই হিসাবে, এই প্লেটে (আরাকান প্লেট) ভূমিকম্প হতে আরও ২০০-২৫০ বছর বাকি আছে।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ‘ফানেল শেপ’ অবস্থায় রয়েছে, যা সমুদ্রের দক্ষিণ দিকে প্রসারিত। সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেছিলেন, আন্দামান বা ভারত মহাসাগরে বড় সুনামি তৈরি হলে, ফানেল শেপের কারণে তার কিছুটা প্রভাব বাংলাদেশেও এসে লাগবে, যদিও তা ইন্দোনেশিয়ার মতো ভয়াবহ হবে না। ভূমিকম্প সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক করা সম্ভব না হলেও, ভূমিকম্পের পরে সুনামি সৃষ্টি হলে তা সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক করা যায়।

তবে, বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সমুদ্রে ভূমিকম্পের চেয়ে অভ্যন্তরে ভূমিতে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিই বর্তমানে বেশি উদ্বেগের কারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *