গুগলের কাছে কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ প্রসঙ্গে সরকারের ব্যাখ্যা

**গুগলের কাছে কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ প্রসঙ্গে সরকারের ব্যাখ্যা**

* অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন ২০২৫) গুগলের কাছে মোট ২৭৯টি কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ জানিয়েছে।
* সরকার জানিয়েছে যে, ভুল তথ্য, অপপ্রচার এবং বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ করা হয়েছে, তবে দেশি পত্রিকার খবর, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ভিডিও বা ব্যক্তিগত সমালোচনামূলক কনটেন্ট অপসারণের জন্য কোনো অনুরোধ করা হয়নি।
* গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট অনুসারে, এই অনুরোধের ৬৫ শতাংশ ‘অপর্যাপ্ত তথ্য’ (Not enough information) ক্যাটাগরিতে পড়েছে।
* সরকারের ভাষ্যমতে, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকারের অনুরোধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
* সরকার সাইবার স্পেসকে নিরাপদ রাখা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে।

**গুগলের কাছে কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ প্রসঙ্গে সরকারের ব্যাখ্যা**

ঢাকা: চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশ সরকার গুগলকে মোট ২৭৯টি কনটেন্ট সরানোর জন্য অনুরোধ করেছে। এ বিষয়ে সরকার এক বিবৃতিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে।

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) প্রধান উপদেষ্টার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার বাংলাদেশের নাগরিকদের আশ্বস্ত করছে যে, ভুল তথ্য, অপপ্রচার এবং বিদ্বেষপূর্ণ চরিত্র হননের বাইরে দেশের কোনো পত্রিকার সংবাদ, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত পোস্ট, ভিডিও কনটেন্ট, রিলস, অনলাইনে প্রকাশিত আর্টিকেল, অথবা কোনো সমালোচকের রাজনৈতিকভাবে সমালোচনামূলক কোনো কনটেন্ট সরানোর জন্য সরকার কোনো প্ল্যাটফর্মকে অনুরোধ করেনি।

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ভুল তথ্য, অপপ্রচার এবং অবৈধভাবে মানহানিকর তথ্য দিয়ে কারও চরিত্র হননের চেষ্টা সংক্রান্ত তথ্য অপসারণের অনুরোধগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মাধ্যমে বিটিআরসিতে পাঠানো হয়।

সরকার জানিয়েছে যে, তারা আওয়ামী লীগের মতো কোনো বট বাহিনী পরিচালনা করে না এবং বিটিআরসি বা এনটিএমসি-সহ বাংলাদেশের কোনো সংস্থা সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কন্টেন্ট ডাউন করার ক্ষমতা রাখে না। তাই যেকোনো অনুরোধ সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়া ও টেক প্ল্যাটফর্মকে জানাতে হয়।

গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জানুয়ারি-জুন ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৭৯টি অনুরোধ করা হয়েছে। এটি আওয়ামী লীগ সরকারের জুন-ডিসেম্বর ২০২২ সময়কালের মোট সংখ্যার (৮৬৭) প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম। আগের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৪) বাংলাদেশ মাত্র ১৫৩টি অনুরোধ করেছিল, যা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ অনুরোধ সংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম এবং জুন-ডিসেম্বর ২০২৩ সময়ের (৫৯১) অর্ধেকেরও কম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট অনুরোধের ৬৫ শতাংশ ‘অপর্যাপ্ত তথ্য’ (Not enough information) ক্যাটাগরিতে পড়েছে, যার অর্থ এগুলোর বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।

এই সময়কালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে ভুল তথ্যের প্রচারণার শিকার হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর গণমাধ্যম থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ভুল তথ্য ও অপপ্রচার চালানো হয়েছে। সরকার এসবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রিপোর্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গুগলকে সরবরাহ করেছে।

এছাড়াও, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিটি) বিচার শুরুর পর বাংলাদেশে সাইবার স্পেসে দেশের ও সরকারের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য প্রচার এবং সন্ত্রাসের আহ্বান জানানো হয়েছে।

দেশের সাইবার স্পেস নিরাপদ রাখা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিভিন্ন ধর্মীয়, জাতিগত ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে অনলাইন ও অফলাইনে সুরক্ষা প্রদান সরকারের দৈনন্দিন দায়িত্বের অংশ। যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়া ও সাইবার স্পেস দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে, তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারকেও নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু রিপোর্ট করতে হয়। পাশাপাশি, সরকার অনলাইন জুয়া এবং গ্যাম্বলিং সংক্রান্ত কিছু কনটেন্ট অপসারণেরও অনুরোধ করেছে।

গুগলের স্বচ্ছতা রিপোর্টে ভুল তথ্য, অপপ্রচার এবং চরিত্র হনন সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো বিভাগ না থাকায়, এই অনুরোধগুলো ‘সরকারের সমালোচনা’ ক্যাটাগরিতে দেখানো হয়েছে। তবে, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা এক-পঞ্চমাংশেরও কম।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশের পূর্বে তাদের ব্যাখ্যা বা বক্তব্য নেওয়া হয়নি, যা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী।

জানুয়ারি-জুন ২০২৫ সময়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে শতাধিক বড় আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক ঘটনা এবং গণপিটুনির ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, বছরের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল। এই সময়কালে দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সরকারকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করতে হয়েছে।

সরকার আরও জানায় যে, আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং এবং সূচকে দেশের বাকস্বাধীনতা ও ইন্টারনেট সূচকের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের এই অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশেষ করে, ফ্রিডম হাউসের Freedom on the Net 2025 রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ইন্টারনেট স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই উন্নতির পেছনে ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ফলে সরকারের পরিবর্তন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সহায়ক হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *